Headlines
Loading...
Science vs Superstition in bengali | বিজ্ঞান ও কুসংস্কার পার্ট ৪

Science vs Superstition in bengali | বিজ্ঞান ও কুসংস্কার পার্ট ৪

SCIENCE-vs-SUPERSTITION

আমাদের বিজ্ঞান ও কুসংস্কার সিরিজের এইটি হলো চতুর্থ প্রবন্ধ (পার্ট ৩ পড়ুন)।গত তিনটি প্রবন্ধে আমরা অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। ঠিক একই রকমভাবে এই প্রবন্ধটি তেও আমরা সেরকমই কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করব ও কুসংস্কার গুলিকে বিজ্ঞানের দৃষ্টিকনে দেখার চেষ্টা করব।

● বিবাহের দিন বর ও কনেকে উপোস করানো হয় কি কারণে? 

শাস্ত্রে আছে মানুষ না খেয়ে মরে না খেয়েই মরে। অর্থাৎ মানুষ দু-এক দিন না খেলে মরে না কিন্তু অতিরিক্ত খাওয়ার ফলে মানুষের মৃত্যু হতে পারে। মৃত্যু না হলেও অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা ভুরিভুরি দেখা যায়। যাইহোক, বিয়ের দিন সাধারণ ভাবেই পাত্র-পাত্রী মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। এর মধ্যে খাওয়া-দাওয়ার অনিয়ম ঘটলে পেটের নানারকম রোগ হতে পারে। এর মধ্যে সাধারণ রোগ হলো অম্বল, অজীর্ণ, গ্যাস, মাথা ধরা, বমি হওয়া প্রভৃতি।

এসব ছোটখাটো রোগের কারণেও বিয়ের সময় পিছিয়ে যেতে পারে বা লগ্ন ভ্রষ্টা হতে পারে মেয়ে। তাছাড়া এতবড় একটা সামাজিক অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। সে কারণেই এই প্রথা আজও বর্তমান। এবং তা যুক্তি সঙ্গ।

তাছাড়া বিয়ের আগেরদিন থেকে বাসররাত্রি পর্যন্ত দেহের ও মনের ওপর একটা উত্তেজনাভাব থাকে। এসময় গুরুপাক খাদ্য খাবার পলে শরীর অসুস্থ হয়ে অনুষ্ঠানটি নষ্ট হতে পারে। তাই সাবধান হবার জন্য বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত উপোস পালন করা হয়। প্রথাটি শারীরিক এবং সামাজিক দিক থেকে যুক্তিযুক্ত।

● রাতে শাক খাওয়া উচিত নয় কেন? 

যে কোন শাকই পিত্তবৰ্দ্ধক। দিনের বেলায় শাক খেলে পাকস্থলী তা হজম করতে সক্ষম। কিন্তু রাত্রে পিত্তবৰ্দ্ধক জিনিস খেলে তা হজম হতে অসুবিধা হয় এবং দেহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই রাত্রে শাক খাওয়া উচিত নয়। প্রথাটি বিজ্ঞানসম্মত।

● বেলপাতা ছাড়া যজ্ঞ হয় না কেন? 

যে কোন যজ্ঞ বা হোমে বেলপাতার প্রয়োজন সবার আগে। এছাড়া অন্য কোন পাতার প্রয়োজন হয় না। এর কারণ, বেলপাতায় এমন একটি অগ্নিদ্দীপক পদার্থ আছে যা কাঁচা অবস্থায় সহজেই জ্বলে এবং বেলপাতায় অন্যান্য জলীয় রস-এর পরিমাণ এত কম যে তা আগুন জ্বালাতে সাহায্য করে। অন্য কোন গাছের কাঁচা পাতার এই গুণ নেই। তাই প্রাচীনকাল থেকে হোম বা যজ্ঞে বেলপাতার প্রচলন হয়ে আসছে।

● শ্মশান থেকে এসে নিমপাতা ও আগুনের ব্যবহার করা হয় কেন? 

এখনোও শ্মশান থেকে এসে আগুন না ছুঁয়ে নিমপাতা না খেয়ে ঘরে ঢুকতে দেওয়া হয় না। ভাবতে অবাক লাগে প্রাচীন মানুষ কতটা শরীর সচেতন ছিলেন। তখনকার যুগে এত ঔষধের আবিষ্কার হয়নি। শ্মশান থেকে আগত ব্যক্তির দেহে বিভিন্ন রোগের জীবাণু লেগে থাকা অস্বাভাবিক নয়। একমাত্র আগুনের তাপে একে ধ্বংস করা যায়। শরীরের ভেতরে যদি কোন জীবাণু ঢুকে থাকে তা নিমপাতার রসে বিনষ্ট হয়। তাই এই প্রথা যুক্তিসঙ্গত।

● ভাদ্র মাসে লাউ এবং মাঘ মাসে মূলো খেতে নেই কেন?

বর্তমানেও এই প্রথা চালু আছে যে, ভাদ্র মাসে লাউ এবং মাঘ মাসে মূলো খেলে বংশ নষ্ট হয়। এর পেছনে যে যুক্তি কাজ করছে তা হলো, উক্ত মাসে লাউ এবং মূলো এর মধ্যে একধরণের সূক্ষ্ম জীবাণু দেখা যায় যা আমাদের সুস্থ সবল সন্তান উৎপাদন করতে বাধার সৃষ্টি করে। তাই সুস্থ, সুন্দর বংশের দিকে তাকিয়ে আমরা এই প্রথাটি মেনে চলি।

● বাড়ির উঠোনে আমড়া গাছ লাগাতে নেই কেন? 

গ্রামে গঞ্জে শোনা যায়, বাড়ির উঠোনে আমড়া গাছ লাগাতে নেই। রাত্রে আমড়াগাছে ভূত থাকে। আজকের এই বিজ্ঞানের যুগে দাঁড়িয়ে ভূতের কোন অস্তিত্ব আছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু সাবধানতার দিক থেকে প্রথাটি যুক্তিসঙ্গত। কারণ আমড়া গাছের ডাল খুব নরম। যে কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে চট করে ভেঙে পড়ে বিভিন্ন বিপদ ঘটাতে পারে। এছাড়া ছোটরা আমড়া খাওয়ার লোভে যখন তখন গাছে উঠতে পারে। ফলে ডাল ভেঙ্গে পড়ে ছোটদের বিপদ ঘটতে পারে।

● চৈত্র ও পৌষ মাসে বিবাহ দিতে নেই কেন? 

শাস্ত্রমতে চৈত্র মাসে বিবাহ হলে কন্যা মদনোন্মত হয়। অর্থাৎ কামভাবে জর্জরিত হয়, যা শরীরের পক্ষে আদৌ মঙ্গলজনক নয়। বিজ্ঞানও একথা স্বীকার করে যে, প্রখর তপ্ত আবহাওয়ায় মানুষের শরীরে কামভাব বেশী আসে, এমনকি শীতপ্রধান দেশের তুলনায় গ্রীষ্মপ্রধান দেশের ছেলেমেয়েদের মধ্যে যৌবন আসে অনেক তাড়াতাড়ি। সেজন্যই এ প্রথা। আবার অনেকের মতে চৈত্র মাসে রবিশস্য ওঠে। ফলে এসময় ঐ শস্য কাটা মাড়া ও তা গোলাজাত করার কাজে সবাইকে ব্যস্ত থাকতে হতো। সেজন্যই ঐ মাসে বিবাহ দেওয়া হ’তো না অর্থাৎ বিবাহ করা বা দেওয়ার মতো সময় পাওয়া যেত না।

এছাড়া শাস্ত্রমতে, পৌষমাসে বিবাহ হলে কন্যা আচারভ্রষ্টা ও স্বামিবিয়োগিনী হয়। কিন্তু আমার মতে, সে যুগে পৌষ মাসে মানুষ নানা কাজে ভীষণ ব্যস্ত থাকতো। বিশেষ করে পৌষমাসে ধান ও অন্যান্য ফসল-সব্জি প্রভৃতি উঠতো। এই ধান কাটা এবং তা ঝাড়াই-বাছাই করে সারাবছরের জন্য সঞ্চয় করে রাখার কাজে সমাজের সব মানুষই এইসময় ব্যস্ত থাকতো। ফলে এইমাসে তাদেরপক্ষে বিবাহের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়া সম্ভব হতো না। এ কারণেই এই মাসে বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়। যদি এ ব্যাপারে পাঠকেরা অন্যকোন ধারণা দিতে পারেন, তবে তা আমাকে লিখে জানাতে পারেন।

● ‘জন্মমাসে’ বিবাহ নিষিদ্ধ কেন? 

শাস্ত্রমতে, জন্মমাসে বিবাহ করলে বিবাহিত ব্যক্তির ধনপুত্র নাশ হয় ও সে ব্যক্তি মহাদুঃখে দিনপাত করে থাকে। এছাড়া বিভিন্ন বিপদের মধ্যেও সে জড়িয়ে পড়ে। অবশ্য বশিষ্টমুনি বলেন, পুরা জন্মমাস নয়, কেবল জন্ম তিথিতেই বিবাহ হলে ঐসব বাধাবিঘ্ন উপস্থিত হয়ে থাকে।

● বিবাহে সেলাই করা পোষাক পরতে নেই কেন? 

এই প্রথাটি আজও অনেকে মেনে চলেন। বিয়ের সময় বর খালি গায়ে, একটি শাল বা ওড়না জড়িয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসে। কিন্তু কনের পক্ষে তা সম্ভব হয় না হলে সেলাই করা ব্লাউজই তাকে পরতে হয়। সে যাই হোক, এই প্রথার পিছনে কোন কল্যাণমুখী উদ্দেশ্য বা বিজ্ঞান ভিত্তিক কারণ কিছুই নেই।

অতীতকালে, মানুষের এত বিভিন্ন রকম পোষাক ছিল না। সেলাই-এরও চল সেদিন ছিল না। থান কাপড়ই মানুষ তৈরী করতে শেখে এবং সেই কাপড়ই প্রয়োজন মতো গায়ে জড়াতো বা মাথায় বাঁধতো। মেয়েরাও একটি কাপড় পরে সারাজীবন কাটিয়ে দিত। এখনো অনেক গ্রামে ব্লাউজের চল নেই। অনেক সময় আবার মেয়েরা ব্লাউজের মতো করে বুকে একখণ্ড কাপড় বাঁধতো। টিভিতে রামায়ণ মহাভারতেও এরকম পোষাক দেখা যায়।

সে যাইহোক, অতীতকালে যেহেতু সেলাই করা কাপড় পরে বিয়ে করা হতো না, তাই অনেকে ভাবেন সেলাই করা পোষাক পরাটা বুঝি নিষিদ্ধ। কিন্তু তা নয়, সেযুগে সেলাই করা কাপড় পাওয়া যেত না বলেই পরা হতো না, অন্য কারণে নয়।

● ছাদনাতলায় ‘কলাগাছ' বসানো হয় কেন?

চারটি কলাগাছ চৌকাকারে পুঁতে ছাদনা তলা তৈরি করা হয়। এই শুভ অনুষ্ঠানে কলাগাছ থাকার মূলকারণ হলো, গণেশ এর বিয়ে হয়েছিল কলা গাছের সঙ্গে; সেকারণেই কলাগাছকে হয়তো পবিত্র বা শুভ বলে মনে করা হয়। এর অন্য কারণও থাকতে পারে, তা হলো কলাগাছ সহজলভ্য ছিল এবং ছাদনাতলা সাজানোর কাজে উপযোগী ছিল।

যদি প্রবন্ধটি ভালো লেগে থাকে এবং আপনিও যদি এরকম কোন তথ্য আমাদের কাছে তুলে ধরতে চান তাহলে অবশ্যই কমেন্টে করুন।  প্রবন্ধটি আপনার বন্ধুর সঙ্গে শেয়ার করে দিন পরবর্তী বিজ্ঞান ও কুসংস্কার পার্ট ৫ পড়ুন।

0 Comments: